সীমান্তে মায়ানমারের সেনা সমাবেশ, বিএনপির প্রতিবাদ

সীমান্তে মায়ানমারের সেনা সমাবেশ, বিএনপির প্রতিবাদ

আমারদেশ প্রতিদিন ডেস্ক: বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্তে গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ভোর থেকে মাছ ধরার ট্রলারে করে মিয়ানমারের সেনাদের সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ করার কথা উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি।
শুক্রবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সন এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন,
গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, দুই দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের অন্তত তিন পয়েন্টে কা নিউন ছুয়াং, মিন গা লার গি ও গার খু এ ট্রলার থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সৈন্যদের নামতে দেখা গেছে। সীমান্ত পয়েন্টগুলোর মধ্যে একটির দূরত্ব আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখার (২০০ মিটার) মধ্যে। ওই তিন পয়েন্টে মাছ ধরার ট্রলারের কাঠের নিচে বসিয়ে সৈন্যদের জড়ো করা হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা মিয়ানমার সেনাবাহিনী এক দিনেই এক হাজারের বেশি সৈন্যের সমাবেশ ঘটিয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে গণহত্যা শুরুর সময়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ঠিক একইভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সৈন্যসমাবেশ করেছিল। ফলে ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০ ভোরে শুরু হওয়া সেনাসমাবেশের কারণে রাখাইনে এখন যেসব রোহিঙ্গা রয়েছেন, তাদের মধ্যে নতুন করে ভীতি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সন্দেহজনক গতিবিধির মাধ্যমে এ ধরণের সেনাসমাবেশ বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ও মিয়ায়নমারের রাখাইনে আবদ্ধ রোহিঙ্গাদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। একই সাথে এ ধরণের অনাকাঙ্খিত সেনা তৎপরতা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি রক্তচক্ষুর বার্তার সমতুল্য ।
তিনি বলেন, বিনা উসকানিতে সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত বিতর্কিত আন্তর্জাতিক সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ ধরণের সমাবেশ শুধু যে মিয়ানমারের নৃতাত্ত্বিক রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর জন্য আতঙ্কের বিষয় তাই নয়। একই সাথে এটা চলমান আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের প্রতি মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্র কর্তৃক আইন অবমাননার চূড়ান্ত বহিপ্রকাশ এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
মির্জা ফখরুল বলেন, রোহিঙ্গা গণহত্যা ও জাতিগত নিপীড়ন-নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার তিন বছর পূর্তির প্রাক্কালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ ধরণের তৎপরতা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিক ফলাফলমাত্র। প্রায় ১২ লক্ষাধিক(গণমাধ্যমে প্রকাশিত) শরণার্থী সমস্যা সমাধানে যে ধরনের সমন্বিত বহুমুখী তৎপরতা নেয়া অত্যাবশ্যক ছিল ২০১৭ সালের আগস্টে সর্বশেষ রোহিঙ্গা সমস্যার সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বর্তমান গণবিচ্ছিন্ন ও জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন অবৈধ সরকার তা নিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতিতে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক মিত্রদের যুক্ত করে বাংলাদেশ দুই-দুইবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকে বাধ্য করেছে। সরকারের সামনে সমস্যা সমাধানে এ ধরনের ঐতিহ্যগত পররাষ্ট্রনীতির সফলতা থাকা সত্ত্বেও সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেন, ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের রক্তের সম্পর্ক। আর চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক। কোনোভাবেই এই সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার নয়’ । ঠিক তখনই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এই দুই বন্ধু রাষ্ট্র ভারত ও চীন সহ কাউকেই আমাদের পাশে পাইনি। এমনকি সাম্প্রতিককালে আমাদের অন্যতম বিনিয়োগ অংশীদার রাশিয়াকেও আমরা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি।
কিন্তু লাগাতারভাবে একনায়ক রাষ্ট্রক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে বিরোধীদের উপর সীমাহীন নির্মম দমন-পীড়ন ও ৩০ ডিসেম্বরের মতো মধ্যরাতের নির্বাচনের বিতর্কিত বিষয়গুলো কারণে বহির্বিশ্বে শেখ হাসিনা সরকারের গ্রহণযোগ্যতা যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তা ফিরে পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায়ই আমাদের দলবাজ কূটনীতিকদের বেশির ভাগ সময় কেটে যায়।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে অগ্রাধিকার বিষয় হওয়া বাঞ্চণীয় ছিলো রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধান। সরকারের সামগ্রিক কার্যকলাপ বিবেচনায় এ ধরনের অগ্রাধিকার সর্বতই অনুপস্থিত। এর বড় প্রমাণ হচ্ছে, এখন পর্যন্ত এই সমস্যার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী কোনো বিশ্ব নেতার সাথে সাক্ষাত করেননি, বিশ্ব সফর করেননি এবং জাতিসংঘে সেইভাবে গুরুত্বসহকারে বিষয়টাকে তুলে ধরতে পারেননি। যার ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আমরা বৈশ্বিক,আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক সকল স্তরেই ব্যর্থ হচ্ছি।
তিনি বলেন, বর্তমান গণবিচ্ছিন্ন সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির সুযোগে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আজ কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি , সরকারের এ দুর্বল নীতি আজ মিয়ানমার সরকারের কাছেও স্পষ্ট। এর পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেই মূলত মিয়ানমার সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ অযাচিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সীমান্তে সেনাসমাবেশ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির পক্ষ থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এহেন সেনা সমাবেশের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2020
Design BY Soft-Mack